মায়ার শহরে ছয় বছর…





ডা. ইশতিয়াক আহমেদ, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজঃ
যদি প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব কষি তাহলে একমাত্র প্রাপ্তি হলো এই শহর আমাকে দিয়েছে আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার নিজের নামের আগে “ডাক্তার” শব্দটি আর অপ্রাপ্তি???জীবনের সবচেয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতাগুলোও এই মায়ার শহরেরই দেয়া,,, হাহাহা…বাদ থাকুক না সব খারাপ স্মৃতিগুলো,সেগুলো থাকুক শুধু স্মৃতিতেই…শুধু সুখকর মুহূর্তগুলো কুড়িয়ে,একরাশ সেরা অনুভুতিগুলো ঝুলি ভরে নিয়ে যেতে চাই এই মায়ার শহর থেকে…

তবে একটা স্মৃতি নিয়ে সবার অনেক প্রশ্ন ছিলো,উতসাহ ছিলো আর তার প্রসংগে আমি বরাবরই নিশ্চুপ থাকতাম,,,আজ তাই খারাপ হলেও শুধু সেই একটা স্মৃতিই রোমন্থন করে যেতে চাই….

এ মায়ার শহরে এসেছিলাম খালি হাতে,ফিরেও যাচ্ছি খালি হাতে…
ডাক্তার শব্দটি উপহার দিলেও এই শহর ১৯/১২/২০১৮ তারিখে কেড়ে নিয়েছে আমার জীবনে আমার সকল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অর্জনগুলো…পার্থিব উপকরনগুলো বাদ দিলাম,,,কিন্তু কারো হাত-পা না চেটে,নিজের আত্মসম্মান বিক্রি না করে, আমার শিক্ষকদের উপর মহলে হতে লবিং নামক শব্দে অসম্মানিত না করে সৎভাবে পাস করা পেশাগত পরীক্ষাগুলোর সকল সার্টিফিকেট গুলো,আমাকে ডাক্তার হিসেবে স্বীকৃত করা সার্টিফিকেট টুকুও কেড়ে নিয়ে গেছে সেই রাতে এই মায়ার শহর…নিয়ে গেছে আমাকে বিশ্বাস করে আমার কাছে দায়িত্ব দেয়া আমার মেডিসিন ইউনিটের গরিব মানুষের যন্ত্রপাতিগুলোও…

সব হারিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরে পেয়েছি সিসিটিভি ফুটেজ ডিলিট হয়ে যাওয়া,”সামনে নির্বাচন এখন কোন ঝামেলা না”, “আমার এখতিয়ারে না…”, “ঘরের ঝুল পরিষ্কার করবা,,,আমি হোস্টেলে গিয়ে চেক করবো…” “নির্বাচনের পরে জিডি করতে আসেন মিয়া…সময় বুঝে না” ইত্যাদি…আমার মুখে সবসময় হাসি দেখে এক বড়ভাই ভবিষ্যতবাণী করেছিলো যে “সময়ের সাথে এই হাসি ফেইড হয়ে যাবে…” হুম আসলেইতো…আজ একটা কৃত্রিম হাসি চেহারায় চাইলেও লটকাতে পারছি না…একেই মনে হয় হতাশা বলে…হ্যা…জীবনের এই প্রথম হতাশা ভর করেছে আমাকে…আর মনে করতে চাইনা অসহায়ত্বের সেই সময়গুলাকে…

অবশ্য কিছুদিন পর একটু সূর্যকিরণের দেখা দিল এক অজানা নাম্বারের খুদেবার্তায়,,, ৩০হাজার দাম হাকা হয়েছে আমার অর্জনগুলোর…একবার ভাবলাম নিয়ে নেই কিন্তু পরেই মনে হলো আমি যখন ২০১৩ সালে এই মায়ার শহরে পাড়ি জমাই তখন আমার বাবার একটা কথা…

দেশসেরা ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ইচ্ছা আর পরে সুযোগ পেয়েও তা ছেড়ে পদ্মার মত সমুদ্রপাড়ি দিতে আমার কোন ইচ্ছা ছিলোনা…সমুদ্র বললাম কারন আমার জানা ছিলো না একটা নদী পাড় হতেই শুধু আধা ঘন্টা লাগতে পারে…ছোট থেকে অনেক ট্যুর দিলেও পদ্মাপাড়ি এই প্রথম,,,আমার মন খারাপ কমাতে বড় মামা তার বন্দোবস্ত করলেন একটা মোটা অংকের বিনিময়ে ঢাকা মাইগ্রেশনের…আমার বাবা সেদিন যা বলেছিলো এখনো তা পুরোটা মনে আছে অক্ষরে অক্ষরে… “আমার জীবনে অনেক কস্ট করেছি,তোমার দাদা ডায়াগনোসিস ছাড়া মারা গেছে আমি যখন বাপ কি জিনিস বুঝি না আমার সেই বয়সে,তাই তোমাদের দুই ভাইবোনের কাছে এই একটাই চাওয়া,ডাক্তার হও,,,গ্রামে যাও,,,আর এত বছরের আমার ব্যবসার এক পয়সা হারাম নাই,আমি আমার ছেলের রোজগারের প্রথমে হারাম দিয়ে শুরু করে দিয়ে শেষ বয়সে ওর ওই হারাম পাসের ইনকাম খাইতে চাই না…” ছোট থেকে আমার সবকাজে হ্যা বলা,বন্ধুর মত আগলে রাখা এই লোকটা জীবনে প্রথম কিছু চাইছে আমার কাছে…বাবা কেমন হয় দেখে নাই লোকটা,তাই হয়তো টিপিকাল বাবার রাগী অভিনয়টাও আমাদের সাথে সে করতে পারে না,,, তাই চুপচাপ ব্যাগ গুছিয়ে অবশেষে আজমিরী পরিবহণে করে পদ্মা পাড়ি দিয়ে চলে এলাম এই মায়ার শহরে…

এতটা বছর পর ৩০হাজারের এই “হারাম” চুক্তিটা তাই বাতিল করেই দিলাম…অন্তত বুকে হাত দিয়ে এটা বলতে পারি আমার সকল উপার্জন হালাল,কেউ বলতে পারবে না এক পয়সা পাওনাদার কেউ আছেন,অনেক দলগত কাজের টাকার দায়িত্ব পেয়েছি,একটা পয়সাও নিজ পকেটে নেই নাই বরং নিজ পকেট হতে অতিরিক্ত দেয়া ছাড়া…আল্লাহ ছোট জীবনের বাকিটাও এভাবেই পার করুন এই প্রার্থনা…

জানি অনেক ভোগান্তি অপেক্ষা করছে কারন আমি এমন দেশের নাগরিক যেখানে দেশত্যাগকে সর্বোচ্চ কৃতিত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়,,,তাও সৎ আছি এই শান্তি…জানিনা কিভাবে আবার সবকিছু ফিরে পাবো,জানিনা কি আছে সামনে,,,আমার মত অসহায়ের সহায়তো ওই একজন…ওইযে উপরে বসে সব দেখছেন…উনিই একটা ব্যাবস্থা করে দিবেন…
প্রায়ই একাডেমিক বিল্ডিংটার সামনে দিয়ে যাবার সময় যখন খোলা আকাশটায় চোখ পড়তো তখন প্রশ্ন করতাম তাকে….”আর কত দেরী পাঞ্জেরি?দম বন্ধ হয়ে আসছে,,,আপনি কি মুক্তি দিবেন না???”
যাক অবশেষে মুক্তির মিছিলে…সময় এসেছে এ মায়া কাটাবার…

অবশ্য একটা এই মায়ার শহর সকল কিছু কেড়ে নেওয়ার পরও এখানে আমি বারবার ফিরে আসতে চাইবো।কারন এই শহর আমাকে আরো একটা জিনিস দিয়েছে তা হলো একগুচ্ছ দেবদূত…আমার দেবদূত শিক্ষক-শিক্ষিকা,সিনিয়র,ব্যাচমেট,জুনিয়ররা,ফরিদপুরে পরিচিত হওয়া কিছু পরিবার,কিছু সুন্দর মনের মানুষ,আমার কিছু রোগী আর তাদের স্বজন…সারাটা সময় শুধু তাদের জ্বালাইছি,পেইন দিয়েছি,,,বিনিময়ে তারা আমাকে দিয়েছে অকৃত্রিম ভালোবাসা,,,আজীবন কৃতজ্ঞতা আপনাদের প্রতি…আমার হৃদমাঝারে তারা থাকবেন আজীবন অকৃত্রিম ভালোবাসার আর শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে… ভালো থেকো দেবদূতরা…
ধন্যবাদ আমার জীবনে আসার জন্য…

বেলাশেষে এই মায়ার শহরে আমার পরিচিত সকলের প্রতি একটাই অনুরোধ,,,জেনে না জেনে অনেককে নানানভাবে কস্ট দিয়েছি,,,এই খারাপ মানুষটাকে পারলে ক্ষমা করে দিবেন…
ভালো থেকো মায়ার শহর… আবার দেখা হবে ইনশাল্লাহ অন্য কোন পরিচয়ে…কারনে অকারনে,,,

( লেখাটি লেখকের ফেসবুক থেকে নেয়া এবং কোন ধরনের পরিবর্তন ছাড়াই আপলোড করা। টাইমসবাংলার এই পেজে টাইমসবাংলার পাঠকদের পাঠানো লেখা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করা লেখা থেকে বাছাই করা লেখা ছাপা হয়।) 







মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

বিশেষ সংবাদ

আইন ও অপরাধ

স্বাস্থ্য

  • item-thumbnail

    মেথি চা’য়ের উপকারিতা

    Views 20341Likes Rating 12345 টাইমসবাংলা.নেটঃ শরীর সুস্থ রাখতে মেথি চায়ের জুড়ি নেই। সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে মেথি চা খেতে পারেন। যারা ডায়াবেটিসে ভুগছেন ...

কৃষি ও খাদ্য

গনমাধ্যম

ঘোষনাঃ